লালসবুজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার টাকা-জমি দেওয়া শুরু করলে ভুল লোকগুলো সামনে এসে দাঁড়ায়, আসল লোক পায় না। যে সরকারের কাছ থেকে কিছু চাইতে আসে, তাকে সন্দেহের চোখে দেখবেন; তাহলেই আসল জিনিসটা টের পাবেন।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা খালি সরকারের কাছ থেকে এটা চাই, ওটা চাই; বিশেষ করে টাকা চাই, জমি চাই। এগুলো তো অবশ্যই লাগবে। কিন্তু যে মুহূর্তে সরকার তা দিতে শুরু করে, ভুল লোকগুলো সামনে এসে দাঁড়ায় এবং তা নিয়ে যায়; আসল লোক আর পারে না। আমার অনুরোধ— সরকার থেকে কিছু চাইয়েন না, কারণ আসল লোক তা পাবে না; তা বাজে লোকের কাছে যাবে। সে লোক আপনার নাম দিয়ে আরও চাইবে এবং আরও পাবে, যেহেতু তার শক্তি বেড়েছে। তাই সরকারকে বারবার মিনতি করে বলবেন, আমাকে কিছু দিয়েন না; শুধু আমার নীতিটা ঠিক করে দেন, এই কাজটা করে দেন; বাকিটা আমরা সামাল দেব। যে সরকারের কাছ থেকে কিছু চাইতে আসে, তাকে সন্দেহের চোখে দেখবেন; তাহলেই আসল জিনিসটা টের পাবেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা মন্ত্রণালয়ের কথা বলছি, আজকে অনেক কথা হলো। এই মন্ত্রণালয় একটা প্রতীক মাত্র; পুরো সরকার হলো আরও বৃহত্তর সংগঠন। প্রযুক্তির গতি এত দ্রুত যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও নীতি-নির্ধারক দ্রুতগতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। কারণ, সে যে সময় যে উদ্যোগ নিচ্ছে, তা কালকেই পাল্টে যাচ্ছে; কিন্তু সে নিজে পাল্টাচ্ছে না। কাজেই ওই পথে নিয়ে যেতে হলে, যারা নিজের চোখে পরিবর্তনগুলো দেখছে, তাদেরকে ঠেলে ঠেলে ওদেরকে নিয়ে যেতে হবে।
ড. ইউনূস বলেন, আমি বলেছি— সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি একই জায়গায় থাকা ঠিক না। কারণ, তার মন একটা কাঠামোর মধ্যে ফিক্সড হয়ে যায়, সে আর সেখান থেকে বের হতে পারে না। সেখানে বাইরে থেকে যারা নতুন দেখছে, তাদেরকে নিয়ে আসতে হবে। এটি এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে যদি এমন লোক আসে যার প্রযুক্তির জ্ঞান ৩০ বছর আগের, তবে এই ৩০ বছরে দুনিয়া পাল্টে গেছে। সে যে সেকেলে রয়ে গেছে, তা তার দোষ না; সে আসলে পরিবর্তন অনুভব করার সুযোগই পায়নি। কাজেই যে পরিবর্তন অনুভব করছে, তাকেই আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে; তাই নীতিতে পরিবর্তন আনো, নীতি ঠিক করো এবং তা বাস্তবায়ন করো। যা মানুষের কাছ থেকে আসবে, তা মানুষকে দিয়ে দাও। প্রযুক্তির গতি এত দ্রুত যে, এখন বাবা-মায়ের চেয়ে ছেলেমেয়েরা আর দাদা-দাদির চেয়ে বাবা-মায়েরা দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। সরকারের কথা চিন্তা করুন—সরকার কত দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। হাসি পায় যখন দেখি পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে নিয়ম-নীতি নিয়ে আসা হয়। মূল জিনিসটা না পাল্টে শুধু তার ওপর সংশোধন করা হয়। ব্রিটিশরা যে নীতি ধরিয়ে দিয়ে গেছে, তার ওপরই সব সংশোধন চলছে। আরে ভাই, মূল জিনিসটাতেই তো গোলমাল। নতুন করে বানাতে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু সেই পরিবর্তনের ধার কেউ ধারে না।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রাজনীতিকদের চিন্তা— মেয়াদটা কাটিয়ে দিয়ে আবার পুনর্নির্বাচিত হওয়া। আমার মনে হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ১০ বছর পর পর একদম গোড়া থেকে নতুন করে বানানো উচিত। কারণ, এর মধ্যে পৃথিবী পাল্টে গেছে, নিয়ম-কানুন ও লক্ষ্য পাল্টে গেছে। সরকারের ধর্ম হলো পুরোনোকে আঁকড়ে রাখা, আর প্রযুক্তির কাজ হলো সেগুলো ফেলে দেওয়া। এই যে দ্বন্দ্ব, এই দ্বন্দ্বে আপনি কাকে জিততে দেবেন? উত্তর পরিষ্কার— প্রযুক্তিকে জিততে হবে। না হলে আমাদের রক্ষা নেই, আমরা ধ্বংস হয়ে যাব।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশ একটি বিষয়ে এখন পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন, তা হলো— জালিয়াতি। সব জিনিস জাল। বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না। ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল— আপনারা নিশ্চয়ই পত্রিকায় দেখেছেন আমেরিকান ভিসাও জাল। একটা জালিয়াতির কারখানা বানিয়েছি আমরা। আমাদের বুদ্ধি আছে, না হলে তো জাল করতে পারতাম না; কিন্তু তা খারাপ কাজে লাগছে। যে জালিয়াতি করতে জানে, তার মধ্যে ক্রিয়েটিভিটি আছে, কিন্তু তা ধ্বংসাত্মক।
তিনি বলেন, আমি মধ্যপ্রাচ্যের একটি রাষ্ট্রের মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করছিলাম। তারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশিদের প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। এমনকি আমাদের মেরিনারদের (নাবিক) ক্ষেত্রেও চরম কঠোরতা দেখাচ্ছে। যখন জাহাজ বন্দরে ভেড়ে, তখন তারা কয়েক দিনের ছুটিতে শহরে ঘুরতে যেতে চায়; কিন্তু আমাদের নাগরিক হলে তাদের জাহাজ থেকে নামতে দেওয়া হয় না। আমি মিনতি জানালাম যে, অন্তত তাদের জন্য যেন অনুমতির ব্যবস্থা করা হয়। ওই মন্ত্রী তখন আমাকে ফাইল খুলে দেখালেন যে, কেন বাংলাদেশিদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। তিনি অনেকের জাল সনদ (সার্টিফিকেট) দেখালেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা যদি আগে থেকে নিজেদের সংশোধন না করি, তবে এই আধুনিক প্রযুক্তিকেও আমরা জালিয়াতির কাজে লাগাব। গোড়া থেকেই এই জালিয়াতির শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। হাজারে-হাজারে মানুষ ভুয়া সার্টিফিকেট ও ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে এবং দুর্ভাগ্যবশত জেনুইন অফিসগুলো থেকেই অর্থের বিনিময়ে সেগুলো ইস্যু করা হচ্ছে। কাজেই আমাদের প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এ দেশ জালিয়াতির কারখানা হবে না, হবে না, হবে না।