‘হ্যারি কেইনের ওপর জাদু করা’ কে এই নানা কওয়াকু বোনসাম?

লালসবুজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ফুটবলে কৌশল, দক্ষতা ও ভাগ্যের পাশাপাশি কুসংস্কার এবং রহস্যময় বিশ্বাসের নানা গল্পও প্রায়ই আলোচনায় আসে। এবারের বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন গোল করতে না পারার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন ঘানার আলোচিত আধ্যাত্মিক চিকিৎসক নানা কওয়াকু বোনসাম। তার দাবি, কেইনের গোল করতে না পারার পেছনে তার প্রয়োগ করা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাব কাজ করেছে।

গ্রুপ পর্বে ঘানা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটি গোলশূন্য সমতায় শেষ হয়। ম্যাচজুড়ে ইংল্যান্ড আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও জালের দেখা পায়নি। কেইনও কয়েকটি সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোনসামের কয়েকটি পুরোনো ও নতুন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি দাবি করেন, ঘানার স্বার্থে কেইনের ওপর সাময়িকভাবে একটি আধ্যাত্মিক প্রভাব প্রয়োগ করেছিলেন।

ম্যাচের আগে বোনসাম বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে কীভাবে নিষ্ক্রিয় রাখতে হয়, তা তিনি জানেন। তার ভাষ্য ছিল, কেইনের কোনো ক্ষতি নয়, কেবল ঘানার বিপক্ষে তাকে গোল করতে বাধা দেওয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য। ম্যাচ শেষে কেইন গোল করতে না পারায় অনেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেও ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবলই কাকতালীয় ঘটনা।

ম্যাচের পর প্রকাশিত আরেকটি বক্তব্যে বোনসাম দাবি করেন, তিনি কেইনের ওপর থেকে সেই প্রভাব সরিয়ে নিয়েছেন, যাতে পরবর্তী ম্যাচে ইংল্যান্ড অধিনায়ক আবার গোল করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আধ্যাত্মিক ব্যক্তি বলেও দাবি করেন।

ঘানার এই আলোচিত ব্যক্তিত্বের নাম নানা কওয়াকু বোনসাম। স্থানীয় ভাষায় ‘বোনসাম’ শব্দের অর্থ অশুভ আত্মা। তবে এটি তার প্রকৃত নাম নয়; পরিচিতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই তিনি এই উপাধি ব্যবহার করেন। ১৯৭৩ সালের ২০ আগস্ট ঘানায় জন্ম নেওয়া বোনসাম নিজেকে ‘দ্য গ্রেট অথেন্টিক ম্যান’ নামে পরিচয় দিয়ে থাকেন।

তিনি ঘানার রাজধানীতে তিনটি আধ্যাত্মিক উপাসনালয় পরিচালনা করেন। তার দাবি, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় দেবতার আশীর্বাদে মানুষের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে আসছেন। ভেষজ চিকিৎসা, তাবিজ-কবচ ও আধ্যাত্মিক পরামর্শের জন্য বিদেশ থেকেও মানুষ তার কাছে আসেন বলে তিনি দাবি করেন। নিয়মিত বিভিন্ন দেশে সফর করে অনুসারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন।

জানা যায়, আফ্রিকার আকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেড়ে ওঠা বোনসাম ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিক চর্চার পরিবেশে ছিলেন। তার চাচা ছিলেন পরিচিত আধ্যাত্মিক চিকিৎসক। তার কাছ থেকেই তিনি বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। পাশাপাশি স্থানীয় গির্জায়ও কাজ করতেন।

বোনসামের দাবি, ১৯ বছর বয়সে গির্জায় যাওয়ার পথে বজ্রপাতের মতো এক রহস্যময় ঘটনার পর তিনি বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী হন। এরপর থেকেই স্থানীয়দের কাছে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পান। তবে তার এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এর আগেও বিভিন্ন বিতর্কিত দাবির কারণে আলোচনায় এসেছেন বোনসাম। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে তিনি দাবি করেছিলেন, পর্তুগালের তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাঁটুর চোটের পেছনেও তার আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাব ছিল। যদিও সেই দাবিরও কোনো বাস্তব বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

আধ্যাত্মিক পরিচয়ের পাশাপাশি বিলাসবহুল জীবনযাপনের কারণেও আলোচিত তিনি। দামি পোশাক, বিলাসবহুল গাড়ি এবং জাঁকজমকপূর্ণ জীবনধারার জন্য প্রায়ই সংবাদে আসেন।

২০২০ সালে ঘানার একটি সংসদীয় আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন বোনসাম। যদিও তিনি নির্বাচিত হতে পারেননি, তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বহুবার আলোচনায় এসেছেন তিনি। একাধিক বিয়ে, বিচ্ছেদ এবং প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। স্থানীয় কয়েকটি প্রতিবেদনে তার সন্তানের সংখ্যা ১৪ বলে উল্লেখ করা হলেও, এ তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

বোনসামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২৫ জন নারী-পুরুষ পারিবারিক, দাম্পত্য ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান চাইতে তার কাছে আসেন। তাদের জন্য তিনি বিশেষ আধ্যাত্মিক আচার সম্পন্ন করেন বলেও দাবি করেন।

তবে হ্যারি কেইন কিংবা এর আগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পারফরম্যান্সে তার কোনো প্রভাব ছিল—এমন দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনো বৈজ্ঞানিক বা বাস্তব প্রমাণ নেই। অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, এসব দাবি ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও লোকজ ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবুও বড় ফুটবল আসর এলেই নানা কওয়াকু বোনসামকে ঘিরে রহস্য, কৌতূহল ও বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে।